সুন্দর জীবনযাপনের জন্য সুস্থতা অত্যন্ত জরুরী। শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবে সুস্থতার মাধ্যমে মানুষ পরিপূর্ণ সুখ লাভ করতে পারে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে আমাদের জীবনের অধিকাংশ সময় কেটে যায় কাজের মধ্য দিয়ে। কাজ কেবল আমাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার উৎসই নয়, কাজ আমাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা দেয়। কাজের মধ্য দিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী, আত্মমর্যাদাবান এবং সুদৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে উঠি। কাজ ছোট বা বড় যাই হোক না কেনো মানসিক অবস্থার উপর এর প্রভাব অনেক বেশি। কাজের অনুকূল পরিবেশ না পেলে কিংবা কাজে সন্তুষ্ট না থাকলে তার প্রভাব ব্যক্তির পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে গিয়ে পড়ে। মানসিক স্থিতিশিলতার অভাবে ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা ধরনের জটিলতায় আক্রান্ত হয়-কাজে অবহেলা করতে থাকে। যার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থাও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। 

গত ১০ই অক্টোবর সারা বিশ্বে পালিত হল ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’। মানসিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক সমস্যা বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর এই দিনটিতে এ দিবস উদযাপন করা হয়। ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০১৭’ এর প্রতিপাদ্য ছিল “কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য”।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতার প্রয়োজনীয়তা

শারীরিক সুস্থতা ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য বছর জুড়ে নানা আয়োজন করে থাকে। কিন্তু মানসিক সুস্থতা বিষয়ক আলোচনাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কর্মক্ষমতা হ্রাসের জন্য বিষণ্নতা (Depression) ও উদ্বিগ্নতা (Anxiety) অতি সাধারণ দুটি মানসিক সমস্যা অন্যতম কারণ। WHO এর মতে, সারা বিশ্বে ৩০০ মিলিয়নের অধিক মানুষ বিষণ্নতায় (Depression) ভোগে যা তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং ২৬০ মিলিয়নের বেশি মানুষ উদ্বিগ্নতা(Anxiety) নিয়ে বসবাস করে। সাম্প্রতিককালে WHO পরিচালিত এক গবেষণায় জানা যায়, বিষণ্ণতা (Depression) আর উদ্ভিগ্নতার (Anxiety) ফলে প্রতি বছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার ক্ষতি হয়। অস্ট্রেলিয়ান পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায় প্রতি পাঁচজনে অন্তত একজন ব্যক্তি কমপক্ষে একটি সাধারণ মানসিক অসুস্থতায় ভোগে। অন্য আরেকটি জরিপ থেকে জানা যায় অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি বছর প্রতি ৫০০০ জনের মধ্যে ২৫% কর্মী মানসিক চাপজনিত কারণে ছুটি কাটায়। কাজের পরিবেশ কর্মীবান্ধব না হলে বা কর্মক্ষেত্রের কোন প্রতিকূল ঘটনা ব্যক্তির মাঝে মানসিক চাপ তৈরি করে যা পরে মানসিক অসুস্থতায় রূপ নেয়।

 

“মানসিকভাবে খারাপ আছি” বুঝবো যেভাবে

কর্মক্ষেত্রের ধরণ অনুযায়ী এ মানসিক চাপ তৈরির কারণগুলো ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণ কিছু কারণ এখানে উল্লেখ করা হলঃ

  • কাজে ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব
  • কাজে একঘেয়েমি
  • স্বচ্ছতার অভাব
  • সঠিক প্রশিক্ষণ ও জ্ঞানের অভাব
  • সঠিক মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি না পাওয়া
  • কর্মে সন্তুষ্ট না থাকা
  • অতিরিক্ত কাজের চাপ
  • সহকর্মী বা বসের সাথে সম্পর্ক
  • কাজ ও ঘরের মধ্যকার দ্বন্দ্ব

নিচে কিছু লক্ষণ দেখানো হল যার দ্বারা বুঝতে পারবেন আপনি অথবা আপনার আশেপাশের কোন সহকর্মী মানসিক সমস্যায় ভুগছেন কিনাঃ

  • প্রতিনিয়ত মন খারাপ থাকা
  • কোন কিছুতে উৎসাহ বোধ না করা
  • প্রচুর ঘুমানো অথবা একদমই ঘুম না আসা
  • সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সাথে দূরত্ব বৃদ্ধি
  • নিত্য অভ্যাস বা কার্যকর্মে পরিবর্তন
  • অনিয়ন্ত্রিত আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ

এছাড়াও কারো কারো ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যা এমনকি মাদকাশক্তিও দেখা যেতে পারে।

কর্মক্ষেত্রে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার উপায়

শরীর আর মন একে অন্যের পরিপূরক। শরীর ভালো থাকলে মন ভালো থাকে। আবার মন ভালো না থাকলে এর প্রভাব শরীরে গিয়ে পড়ে। শারীরিক সুস্থতা আমাদের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে, ইতিবাচক চিন্তাভাবনা তৈরিতে ভূমিকা রাখে, আমাদের প্রাণোচ্ছল ও কর্মোদ্দ্যমী করে তোলে। প্রাণোচ্ছল মানুষ কাজের মধ্য দিয়েই মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার কৌশল অবলম্বন করে। এজন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করা প্রয়োজন এবং সম্ভব হলে দুপুরের খাবারের পর কিছুদূর হাঁটার জন্য কাজে বিরতি নিতে পারেন।

সুস্থ সুন্দর সম্পর্ক আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান পালন করে। তাই বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সাথে অবসরে নিজের মতো করে সময় কাটাতে পারেন। কাজকে সম্পূর্ণ পিছনে ফেলে ওই সময়টুকু মন দিয়ে উপভোগ করুন।

মানসিক চাপ লাঘবের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের বিকল্প নেই। প্রতিদিন অন্তত ৮ ঘন্টা ঘুমের অভ্যাস করতে হবে। প্রতিদিন কি পরিমাণ কাজ করবেন তা পূর্বেই নির্ধারণ করে নিন। তারপর সেখান থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের তালিকা করে সে কাজগুলো শেষ করবার সময় ঠিক করে নিন।

নিজের যত্ন অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়। আপনার ভালো লাগে এমন কোন কাজ করা, হতে পারে গান শোনার মত সহজ কোন কাজ যা আপনার মনকে শিথিল করে দেয়।  মাইন্ডফুল থাকার চেষ্টা করবেন অর্থাৎ বর্তমানে থাকুন, বর্তমানে মনোযোগ দিন, যে কারো কথা মন দিয়ে শুনুন।

সবশেষে, মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সাহায্যের প্রয়োজন মনে হলে বিশষজ্ঞের সহায়তা নিন।

পড়ুন, ভালো থাকার চাবিকাঠি 

 

নিরাপদ ও অনুকূল কাজের পরিবেশ তৈরি করা করা কেবলমাত্র প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নয়। বরং প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের মধ্যকার সম্পর্কের উপর নির্ভর করে তৈরি হয় কাজের পরিবেশ। তাই মানসিক সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং কর্মক্ষেত্রে সুন্দর পরিবেশ রক্ষায় আমাদের প্রত্যকের  সমান দায়িত্ব রয়েছে।

Facebook Comments

Load More Related Articles
  • অন্য জগত

    নাবিলা, সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়া তরুণী। সে মফস্বল এলাকায় বড় হয়েছে। এলাকার অতি পরিচ…
  • ১০ টি আত্ম-উন্নয়নমূলক বইয়ের তালিকা

    যে বই পড়ে না আর যে বই পড়তে পারে না তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই – মার্ক টোয়েন জীবনে …
Load More By Tahmida Nusrat
  • Let Down Effect: স্ট্রেস পরবর্তীকালীন অসুস্থতা

    আসিফ, একটি প্রাইভেট অফিসে চাকরী করেন। প্রায় দেখা যায় কাজের ডেডলাইনের কাঁটা তার মাথার উপর ঝ…
  • সফলতার বেড়াজাল

      বলুন তো আপনি এমন কাউকে জানেন কিনা যিনি মোটেও কোনপ্রকার সাফল্য চায় না? প্রত্যেক ব্যক…
Load More In BLOG

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

অন্য জগত

নাবিলা, সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়া তরুণী। সে মফস্বল এলাকায় বড় হয়েছে। এলাকার অতি পরিচ…