• আসিফ, একটি প্রাইভেট অফিসে চাকরী করেন। প্রায় দেখা যায় কাজের ডেডলাইনের কাঁটা তার মাথার উপর ঝুলতে থাকে। এবং একটা ডেটলাইন শেষ হতে না হতেই আরেকটা এসে হাজির হয়। যেটা তার জন্য প্রচন্ড মানসিক চাপ তৈরী করে।
  • রুম্পা, একজন কর্মজীবী সংসারী মেয়ে। সপ্তাহের ৫ দিন অফিসের কাজের পর দেখা গেলো ছুটির দিনে বাড়িতে একঝাঁক মেহমান এসে হাজির। তখন মেহমানদের আপ্যায়নের কাজ করতে করতেই তার দিন কেটে যায়। বিশ্রামের সময়টুকু আর পাওয়া হলো না। যার ফলশ্রুতিতে পরদিন তিনি প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
  • এদিকে রায়হানের এসএসসি পরীক্ষা চলছে। সে ঠিক করেছে পরীক্ষার পর পরিবারের সাথে কুয়াকাটা যাবে। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই ঠান্ডা-জ্বর আর একরাশ ক্লান্তি পেয়ে বসেছে তাকে! কোথাও যেতে ইচ্ছে করলো না আর।
মূল ঘটনা শুরুর আগে এমন কিছু কাল্পনিক ঘটনা বলে নিলাম। ঘটনাগুলো কাল্পনিক হলেও আমাদের মধ্যকার অনেকের সাথে ঘটনাগুলো মিলে যায়। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি স্ট্রেস (stress) এ থাকাকালীন সময়গুলোর পর কীভাবে নিজেদের সামলিয়ে থাকি? হোক সেটা স্বল্প সময়ের মধ্যে কোনো কাজ শেষ করা কিংবা স্কুল-কলেজের ফাইনাল এক্সাম বা ছুটির দিনে মেহমানদেরকে আপ্যায়ন করা। তারপর এই ব্যস্ত-কঠিন সময়টুকু পার করার পর বেশিরভাগ সময় স্ট্রেসগুলো (stress), ক্লান্তি এবং অসুস্থতা দিয়ে বদলি হয়ে যায়।
 
বেশকিছু গবেষণায়, স্ট্রেস কমে যাওয়ার সাথে অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার একটি সংযোগ পাওয়া গিয়েছে। তাইওয়ানে ২০১৫ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় রবিবারসহ অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে ইমারজেন্সিতে পেপটিক আলসারের রোগী বেশি ভর্তি হচ্ছে। আরেকটি সমীক্ষা মতে, উইকেন্ডে মানুষের প্যানিক অ্যাটাক বেশি হয়। 
কি কারণে স্ট্রেস এর পর আমরা অসুস্থ হয়ে যাই? আদৌ এই অসুস্থতা কি স্ট্রেস এর জন্য হয়? নাকি এখানে অন্য কোনো কারণ কাজ করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রথম কাজ করেছিলেন ডক্টর. মার্ক স্কোন, একজন ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলস এর মেডিসিন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লিনিক্যাল প্রফেসর। ড. স্কোন তার পিএইচডি’র গবেষণা সময় স্ট্রেস এবং অসুস্থতার মধ্যে একটি মিল খুঁজে পেলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, একটি স্ট্রেসফুল সময় পার করার পর যখনই তিনি বিরতি নেন, ঠিক তখনই তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা জ্বরে আক্রান্ত হন। এভাবে তিনি বেশ কয়েকটি স্ট্রেস এবং স্ট্রেস পরবর্তি সময়ে নিজের শারীরিক পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করেন এবং স্ট্রেস ও অসুস্থতার মধ্যে মিল খুঁজে পান। এই যোগসূত্রকে তিনি কোনো কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে নেননি। বরং এরপর তার ক্লায়েন্টদের উপর স্ট্রেস পরবর্তী সময়ের অসুস্থতা (Post-stress Illness) নিয়ে অনুসন্ধান করেন। অবশেষে সাম্প্রতিককালে এই রহস্যের উদঘাটন হয়। নিউরোসায়েন্টিস্ট এবং মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে “Let Down Effect” বলেছেন।
এবার তাহলে এই “Let Down Effect” ব্যাখ্যা করা যাক। ডক্টর. স্কোন-এর মতে, “Let Down Effect” হচ্ছে এমন একটি প্যাটার্ন যেখানে মানুষ স্ট্রেস এ থাকাকালীন সময়ে কোন অসুস্থতা অনুভব করেন না বরং স্ট্রেস এর সময়টুকু পার হয়ে যাওয়ার পর সে অসুস্থতা অনুভব করেন।
 
২০১৪ সালে, আলবার্ট আইন্সটাইন কলেজের মেডিসিন বিভাগের কিছু গবেষক, ৩ মাস ধরে মাইগ্রেইন এর সমস্যায় জর্জরিত ব্যক্তিদের শারীরিক বিভিন্ন উপসর্গ এবং স্ট্রেস প্যাটার্ন ইলেক্ট্রনিক ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করেন। তারা দেখেছেন, অংশগ্রহণকারীদের স্ট্রেস লেভেল বাড়ার সাথে সাথে মাইগ্রেনের উপর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। কিন্তু স্ট্রেসের সময়টুকু শেষ হয়ে যাওয়ার পর এবং পরেরটি শুরু করার আগে, অর্থাৎ, দুটো স্ট্রেস এর মধ্যবর্তী সময়ে (ব্যাপ্তিকাল ৬-১৮ ঘন্টা) তাদের মাইগ্রেন এর সমস্যা দেখা যায়। গবেষকরা এই ঘটনার নাম দেন “Let Down Headace“। 

“Let Down Effect” এর লক্ষণ

  • সর্দিকাশি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা
  • বিষণ্ণতা ( Depression) এবং উদ্বিগ্নতা (Anxiety)
  • তীব্র মাথাব্যথা
  • হজমে সমস্যা
  • অ্যালার্জিজনিত রিঅ্যাকশন
  • ত্বকের সমস্যা
  • প্যানিক আক্রমণ (Panic Attack)
  • অতিভোজন অথবা খাবারে অরুচি
  • জ্বর, অবসাদ ও ক্লান্তি

কী কারণে “Let Down Effect” হয়?

“Let Down Effect” কেন এবং কীভাবে হয় সেটা বোঝার জন্য আমাদের জানতে হবে স্ট্রেস কীভাবে আমাদের দেহকে প্রভাবিত করে।

বিহেভিওরাল নিউরোসায়েন্টিস্ট লিয়া পিটার ব্যাখ্যা করেছেন, তীব্র স্ট্রেস এর সময় দেহ কিছু স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে। যেমন- গ্লুকোকর্টিকয়েডস (কর্টিসল) , ক্যাটেকোলামিন্স ( নরএপিনেফ্রিন) এবং অ্যাড্রেনালিন হরমোন। এই হরমোনগুলো অভ্যন্তরীণ যেকোন ধরণের বিপদ এড়ানোর জন্য দেহকে প্রস্তুত করে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সচল করে দেহকে একটি নজরদারির মধ্যে রাখে এবং আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। স্ট্রেসমুক্ত হলে আমরা ব্যস্ততা থেকে বিরতি নিই, বিশ্রাম নেই, ঘুমাই। অর্থাৎ যখনই আমরা হঠাৎ করে চাপমুক্ত হয়ে যাই, তখনই তা আমাদের দেহে কিছু বায়োকেমিক্যাল পরিবর্তন ঘটায়।আমাদের হরমোন লেভেলেও অনেক পরিবর্তন আসে। আমাদের দেহ সবকিছু নিরাপদ ভেবে দেহের সৈন্যবলকে ফিরিয়ে নেয়। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পরে। দেহ রোগ এবং ভাইরাসের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। যার ফলে ‘Let Down Effect’ হয়ে থাকে।

আলবার্ট আইন্সটাইন কলেজ অন মেডিসিনের আসোসিয়েট প্রফেসর নিউরোসায়েন্টিস্ট ডক্টর. ডাওন বিউজ এর মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে কর্টিসল এবং অন্যান্য স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এই হরমোন ব্যাথার অনুভূতিকে কমিয়ে আনে। তাই আমাদের আসন্ন কোনো আঘাতের কষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য এটি একটি ভাল মাধ্যম। কিন্তু যখন মানসিক চাপের সময়টা কেটে যায়, দেহ আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এতে কর্টিসল এবং অন্যান্য স্ট্রেস হরমোন এর মাত্রাও কমে আসে। এর প্রভাবে মাইগ্রেন, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাথা (Chronic Pain), ফাইব্রোমায়ালগিয়া (মাংসপেশিতে ব্যাথাজনিত সমস্যা) এবং আর্থ্রাইটিস হয়ে থাকে।

ডক্টর. স্কোন এর মতে, আবেগীয় মানসিক চাপ এবং শারীরিক ধকলও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় এবং ‘Let Down Effect’ এর মাধ্যমে আমাদের অসুস্থ করে। স্ট্রেস হরমোন এর মাত্রা কমে গেলে তা মস্তিষ্কে ডোপামিন (নিউরোট্রান্সমিটার) এর মাত্রাও কমিয়ে দেয়। ডোপামিনের স্বল্পতার কারণে অবচেতনভাবে অতিভোজন এবং অ্যালকোহল নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায় (কেননা অ্যালকোহল মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা বাড়াতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে)।

“Let Down Effect” এড়ানোর উপায়

 
কার্ডিওলজিষ্ট ডক্টর. নিকা গোল্ডবার্গ এর মতে, ‘Let Down Effect’ কে এড়ানোর সবচেয়ে বড় উপায় হল, এমনভাবে বিশ্রাম নেয়া যেন আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল থাকে। আমাদের শারীরিক এবং মানসিক উদ্দীপনার মধ্যে যেন একটা সমন্বয় থাকে। সেজন্য কয়েকটি উপায় হলো,
 
  • তীব্র স্ট্রেস এর সময়েগুলোতে ৫-৬ মিনিট হেটে আসুন। রিল্যাক্স হোন।
  • স্ট্রেস দূর করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের বিকল্প নেই। প্রতিদিন অন্তত ৮ ঘন্টা ঘুমের অভ্যাস করতে হবে। ঘুমানোর আগে অবশ্যই সব ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করে নিন। আরামদায়ক পরিবেশে ঘুমান।
  • ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল এবং চা কফি পানীয় থেকে বিরত থাকুন।
  • পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন। অথবা সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর বিকেলে নিজের পছন্দের সহজ কোনো খাবার তৈরী করার জন্য সময় বের করুন। এটাও আপনাকে স্ট্রেস মুক্ত করবে।
  • নিজের যত্ন অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়।আপনার ভাল লাগে এমন কোনো কাজ করুন। তাহলে মন প্রফুল্ল এবং প্রশান্ত থাকবে।
  • নিয়মিত যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন করুন। এতে দেহ শিথিল এবং কর্মক্ষম হবে। স্ট্রেস এবং স্ট্রেসজনিত অসুস্থতা দূর হবে।
  • কর্মস্থলে বা বাসায় লিফট পরিহার করে সিড়ি ব্যবহার করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম এবং সম্ভব হলে সপ্তাহে দুইদিন সাঁতার কাটুন।
  • স্ট্রেস এর পর মস্তিষ্ককে উজ্জীবিত রাখতে পাজল, প্রবলেম সলভিং বা ম্যাথ করুন। ম্যাথের সমাধান আপনাকে বের করতেই হবে এমনটা জরুরী নয়। বরং এর মাধ্যমে ছুটির দিনে মস্তিষ্ককে কিছুটা কর্মক্ষম রাখাটাই আসল উদ্দেশ্য। তাছাড়্রা কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে অল্পসময়ে এবং দ্রুতগতিতে ম্যাথ সলভ করার ফলে আমাদের ইমিউনো সিস্টেম (Immune System) এর কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়।
সবশেষে, মানসিক চাপ বা স্ট্রেস আমাদের জন্য একটা ভীতিকর পরিস্থিতি। কিছুদিন আগেও সবার জানা ছিল, স্ট্রেস অসুস্থতা তৈরী করে। কিন্তু বর্তমান গবেষনা জানাচ্ছে একদম ভিন্ন কথা। স্ট্রেস আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরো সক্রিয় করে। তাই স্ট্রেস ও স্ট্রেস পরবর্তি সময়ে কাজের ভারসাম্য এবং সঠিক উপায়ে বিশ্রাম করে স্ট্রেসকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করুন।
Facebook Comments

Load More Related Articles
Load More By Afsana Rahman
Load More In Academic

3 Comments

  1. Maca root may help prevent bone loss experienced by postmenopausal women. Around 70 percent of men using it
    reported some improvement in achieving and maintaining an erection.
    You will also find the voice recorder, COMPUTER syncing, stereo system
    Bluetooth, The My Nokia application for communication and
    support, along with community portal that may deliver My – Space and Tweets feeds.

    Reply

  2. FamesWaype

    July 14, 2018 at 9:32 pm

    retalis levitra
    [url=http://levitragls.com]levitra 20 mg tablet
    [/url] what dosage levitra
    levitra 20 mg tablet
    – levitra side affects
    levitra levitra levitra

    Reply

  3. Jalonchert

    July 14, 2018 at 9:35 pm

    enzyte
    [url=http://levitragtr.com]levitra 20 mg how long does it last
    [/url] levitra trackback kommentera
    levitra 20 mg price
    – levitra grneric
    lilly levitra medications

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *