রেদওয়ান আয়ান। বয়স ৩০ বছর। বিয়ে করেছেন বছর দুয়েক আগে। একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করত। কিন্তু প্রায় এক বছর হতে চলল অসুস্থতার কারণে সেটা ছেড়ে দিয়েছে। এখন কেবল অন্ধকার ঘরের কোণায় একা চুপটি করে বসে থাকেন। কারো সাথেই তেমন কথা বলেন না তবে মাঝে মধ্যেই প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অথচ এক বছর আগেও কেমন সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলছিল! হঠাৎ করে একদিন আয়ানের মনে হতে থাকে কেউ যেন তার সাথে কথা বলছে অথচ আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। মনের ভুল বলে ধরে নেয় সে। 

এরপর থেকে মাঝে মধ্যেই সে এমন আওয়াজ শুনতে পেত, কিন্তু যখনই আশেপাশে তাকাত দেখতে পেত কথা বলার মতন কেউ নেই! প্রথম প্রথম কিছুদিন পর পর এমনটি হত, কিন্তু ধীরেধীরে ব্যাপারটা ক্রমাগত ঘটতে লাগল। প্রতিনিয়ত যেন কেউ তার প্রতিটা কাজের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে। অন্যকেউ একজন যেন তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। তার চিন্তাভাবনা-কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করছে। সে যা করতে চাইছে তা করতে পারছে না। সে যা শুনছে তার পাশের অন্য মানুষজন সেটা শুনতে পাচ্ছে না।

বিষয়টি পরিবারের অন্যদেরকে জানালে তারা বিষয়টি মোটেও আমলে নেয়নি। সকলেই ধরে নেয় অতিরিক্ত কাজের চাপ আর দুশ্চিন্তা থেকেই হয়ত এমন করছে। কিছুদিন বিশ্রামে থাকলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু এদিকে আয়ানের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। ধীরেধীরে নিজের কাছের মানুষদের উপর বিশ্বাস হারাতে শুরু করে। মানুষগুলোকে তার শত্রু বলে মনে হতে থাকে। মনে হয় একদল মানুষ তার প্রাণনাশের জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। তার পরিবারের, তার আপনজনেরাও এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত! তাকে কেউ আর কেউ ভালবাসে না। সবসময়ের জন্য তার সকল কাজকর্ম আর গতিবিধির উপর নজরদারি করা হচ্ছে। এমনকি সে কখন কি বলছে তাও তার শত্রুরা শুনতে পাচ্ছে। ভয়ে সে বাড়ির বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। ঘরের মধ্যে একা থাকে আর কিছুক্ষণ পরপর ঘরের চারপাশ উকিঝুঁকি দিয়ে দেখে কোন মানুষ কিংবা ক্যামেরা লুকিয়ে আছে কিনা। মনে হতে থাকে তাকে মেরে ফেলার জন্য শত্রুরা হয়তো ঘরের মধ্যেই আছে অথবা সিসি ক্যামেরা লুকিয়ে রেখে সবসময় সে কি করছে-কি বলছে-কি খাচ্ছে এগুলো দেখছে।

আয়ানের এমনসব অদ্ভুত আর অসংলগ্ন কথাবার্তা-কাজকর্মে তার পরিবার একসময় চিন্তিত হয়ে পড়ে। হঠাৎ করে কি হয়ে গেল কিংবা এর প্রতিকার কি- এসব কিছু জানার জন্য পরিবারের মানুষগুলো এদিক সেদিক ছোটাছুটি শুরু করে। অবশেষে ডাক্তারের কাছ থেকে জানতে পারে আয়ান স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। ক্যান্সার, টাইফয়েড আমাদের শরীরের এমনসব গালভরা অসুখের মতন স্কিজোফ্রেনিয়া একধরণের জটিল মানসিক রোগ। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কের সকল স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা লোপ পায়। ব্যক্তি নিজের মধ্যে এক কাল্পনিক জগত তৈরি করে, যার সাথে বাস্তবিক চিন্তাভাবনা কিংবা কাজকর্মের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা যায় যে পৃথিবীতে প্রায় ২৩.৬ মিলিয়নের মতন মানুষ স্কিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেড়গুণ বেশি। আক্রান্ত ব্যাক্তিদের গড় বয়স সাধারণ মানুষদের তুলনায় দশ থেকে পঁচিশ বছর কমে যায়। যার প্রমাণ পাওয়া যায় স্কিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত মানুষদের মাঝে আত্নহত্যার প্রবণতা অন্য রোগে আক্রান্তদের তুলনায় অনেক বেশি [প্রায় ৫% বেশি]। ২০১৫ সালে সারা পৃথিবীতে এক স্কিজোফ্রেনিয়াতেই আক্রান্ত প্রায় ১৭,০০০ মানুষ আত্নহত্যা করে!  

এই গল্পটি হয়ত আমার কিনবা আমাদের আশেপাশের পরিচিত কারো। কিন্তু কাউকে বলতে পারছিনা। বললে মানুষ কী ভাববে! এই ভেবে মন খারাপের কথাগুলো আমরা কাউকে বলিনা। এভাবে ক্রমাগত কথাগুলো চেপে রাখতে রাখতে একসময় আবর্জনার মত দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। হতাশার চাদরে ঢেকে এই জীবনটা হয়ে পড়ে উদ্দেশ্যহীন। আমাদের শরীর যেমন অসুস্থ হতে পারে, এটা যতটা স্বাভাবিক; ঠিক তেমনি আমাদের মনের অসুস্থতাও স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। তাই ভেতরের কষ্ট-হতাশাগুলো নিজের মধ্যে আর চেপে না রেখে আসুন শেয়ার করি। জমে থাকা কথাগুলোর তরল হোক।

Facebook Comments

Load More Related Articles
Load More By Ashraf Shead
  • My philosophy for a happy life

    Facebook Comments Related …
  • অন্য জগত

    নাবিলা, সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়া তরুণী। সে মফস্বল এলাকায় বড় হয়েছে। এলাকার অতি পরিচ…
  • সামান্য মানুষ

    —একটি বাচ্চা ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ পড়ে গেল। একটু ব্যথা পেতেই চিৎকার করে কান্না জুড়…
Load More In Daily Life

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

সামান্য মানুষ

—একটি বাচ্চা ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ পড়ে গেল। একটু ব্যথা পেতেই চিৎকার করে কান্না জুড়…